শিক্ষার লকডাউন (A Lockdown of education / Education in lockdown)

অনিন্দিতা ভদ্র (Anindita Bhadra)


(courtesy : thenewsminute.com)

  গতবছরের আকস্মিক লকডাউনের ফলে এক অপরিসীম বিপদের মুখে পড়তে হয় শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে। এই সময়ে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের প্রশাসনিক বিভাগের নির্দেশে শুরু করা হয় অনলাইনে ক্লাসের প্রথা-পক্রিয়া। এই হঠাৎ সিদ্ধান্তের ফলে একাধারে যেমন নাস্তানাবুদ হতে হয় শিক্ষক শিক্ষিকাদের অনলাইন শিক্ষা মাধ্যমের সাথে সঙ্গতি জোগাতে, অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা উৎসাহ হারাতে থাকে পড়াশোনায়। আমাদের সমাজে শিক্ষা ব্যবস্থার এই বিপুল অবগতির নানান প্রভাব আলোচিত হয়েছে এই লেখায়।



  গত বছর হঠাৎ একদিন জানা গেল যে পরের দিন থেকে দেশ জুড়ে লকডাউন - দোকান, বাজার, অফিস, স্কুল, কলেজ, সব বন্ধ হয়ে গেল রাতারাতি। আমি এবং অয়ন, দুজনেই অধ্যাপনা করি, আই আই এস ই আর বা আইসার কলকাতায়। আমাদের কাজের একটা বড় অংশ গবেষণা হলেও, আইসারের মূল ছাত্রগোষ্ঠী হল বি এস এম এস (BSMS) এর পড়ুয়ারা - অর্থাৎ যারা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনা করছে। দোলের সময় এক সপ্তাহের ছুটিতে অনেকে বাড়ি গিয়েছিল, কেউ কেউ যায়নি, আবার কেউ কেউ বাড়ি গিয়ে ফিরে এসেছিল হস্টেলে, ক্লাস শুরু হবে বলে। হঠাৎ লকডাউন ঘোষণায় আমরা হিমসিম খেয়ে গেলাম। বাড়ি থেকে ফিরতে বারণ করা হল ছেলেমেয়েদের, যারা বাড়ি যায়নি বা ফিরে এসেছে, তাদের বলা হল ফিরতে চাইলে ফিরে যেতে। বেশ কিছু ছেলেমেয়ে আটকে গেল আইসারেই। ঘন ঘন মিটিং হতে লাগল, কিভাবে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা হবে, কি করে যথেষ্ট নিরাপত্তা বজায় রাখা হবে হস্টেলে, ইত্যাদি নিয়ে। এরপর শুরু হল নতুন চিন্তা - সেমেস্টারের অর্ধেক এখনো বাকি, ক্লাস নেওয়া হবে কিভাবে, কিভাবে শেষ হবে সেমেস্টার। শুধু আমরা নই, সারা পৃথিবী জুড়েই সেই সময় একই সমস্যা, স্কুল, কলেজ, সমস্ত স্তরের শিক্ষাক্ষেত্রে।

  এরপরের গল্পটা আমাদের সবার জানা - ঘরে ঘরে শুরু হলে অনলাইন ক্লাস, আগে প্রয়োজন বা সামর্থ না থাকলেও, বাধ্য হয়ে কিনতে হল অনেককেই স্মার্ট ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার। দেড় বছর ধরে চলতে থাকা করোনার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধে মাস্ক, স্যানিটাইজারের সঙ্গে এরাও হয়ে উঠল আমাদের হাতিয়ার। শুরু হল নতুন এক জীবন - এ যেন Isaac Asimov এর গল্পের পৃথিবী - কেউ কারো মুখ না দেখে দিনের পর দিন কথা বলে যাওয়া মানুষ, সারা পৃথিবী হাতের মুঠোয় ধরা একটা স্মার্ট ফোনের পর্দায় বন্দী, চাইলেই যোগাযোগ করা যায় দূরের বন্ধুদের সঙ্গে, তবুও অসীম দূরত্ব সবার মধ্যে। সামাজিক দূরত্বের এই পৃথিবীতে ক্লাসরুম ঢুকে পড়ল আমাদের শোয়ার ঘরে, ডাইনিং টেবিল হয়ে উঠল পড়ার জায়গা, ক্লাসের মাঝখানে শোনা যেতে লাগল প্রেসার কুকারের ডাক, বাচ্চার কান্না, বোকা বাক্সের শব্দ। শিক্ষার সমস্ত চেহারাটাই যেন পাল্টে গেল রাতারাতি।

  আজকাল Zoom, Google meet, ওয়েবিনার, এগুলো রোজকার কথাবার্তার বিষয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগেও যেভাবে রোজকার যোগাযোগ চালাতেন প্রবাসে থাকা মানুষেরা দেশের আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে, সেভাবেই আমাদের যোগাযোগ চলছে পাশের শহরে বাবা-মায়ের সঙ্গে, পাশের বাড়ির অফিস কলীগের সঙ্গে, বা একই পাড়ায় থাকা ছাত্রীর সঙ্গে। আজ সত্যি মনে হয়, “তারারাও যত আলোক বর্ষ দূরে….. তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে”।

  শিক্ষককূল নাস্তানাবুদ

  অনলাইন পড়ান নিয়ে আজকাল অনেক রকমের মীম আর চুটকিট ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। এদের মূল বক্তব্য হল, ছত্রছাত্রীরা কিছুই শিখছে না আসলে এভাবে, এবং ভবিষ্যতে এদের অনেক সমস্যায় পড়তে হবে এই কারণে। যখন অনলাইন পড়াশোনা শুরু হল, কলকাতা ও তারপর পশ্চিমবঙ্গের আরো অনেক জায়গায় একটা বিষয় নিয়ে কিছুদিন খুব হইচই চলল - স্কুলের, বিশেষ করে দামী স্কুলগুলোর মাইনে দিতে নারাজ বাবা-মায়েরা, কারণ স্কুল বন্ধ, বাড়িতে বসে শিক্ষকরা কেন পুরো মাইনে পাবেন? সেসব এখন পিছনে ফেলে এসেছি আমরা, সরকারের মধ্যস্থতায় একটা উপায় হয়েছে সেই সমস্যার। কিন্তু শিক্ষককূলের আসল সমস্যার সমাধান তো সহজ নয় - নতুন এই পদ্ধতিতে পড়াতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হলাম আমরা অনেকেই।

  স্কুল বা কলেজ, সব স্তরের শিক্ষকতায় চেনা কিছু জিনিস চিরকালের সঙ্গী - ব্ল্যাকবোর্ড, চক, ডাস্টার, বই, খাতা, পেন, এসব ছাড়া আমরা পড়ানোর কথা ভাবতেই পারতাম না দেড় বছর আগেও। আর এখন, পড়াতে গেলে প্রয়োজন কিছু যন্ত্র বা গ্যাজেট - কম্পিউটার, ফোন, এসবের পাশে পাশে রয়েছে আধুনিক ডিজিটাল বোর্ড, স্মার্ট পেন, আর নানান app। “আমার কথা শোনা যাচ্ছে?”, “রিতু, প্লীজ মিউট”, “মিস, আপনার লেখা বোঝা যাচ্ছে না”, “স্যার, আমার নেট চলে গিয়েছিল”, এগুলো রোজকার ক্লাসের স্বভাবিক কথাবার্তা। এখন আর বাচ্চারা বলে না, “মিস, আমার লেখা হয়নি, বোর্ড মুছবেন না”, এখন ক্লাস করলেই বা কি, না করলেই বা কি, দিনের শেষে সবকিছুই পৌঁছে যাবে Whatsapp দিয়ে যার যার ফোনে, লিখে নেওয়া যাবে সবটাই। আর না লিখেলেও কিছুই সমস্যা নেই, ওই ফোনেই পড়ে নেওয়া যাবে ইচ্ছে মত।

  বোর্ডের অভাবে আমরা, শিক্ষকরা যতটা না কাতর, তার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের না দেখতে পাওয়ায়। পড়ানোর সময় ওদের চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কে বুঝতে পারছে, আর কে বোঝার ভান করছে। ক্লাসের পেছনে লুকিয়ে দুষ্টুমি করা বা ঘুমিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ধরে ফেলা যায় একটু পায়চারী করলে, আর সেই সঙ্গে তাদের বন্ধু হয়ে ওঠা যায় আস্তে আস্তে। কলেজের ক্লাস জমিয়ে রাখে নানান আলোচনা, তর্ক, আর সেভাবে শিখলে ভোলে না কেউ সহজে। বই পড়ে পরীক্ষা দিয়ে অনেক কিছুই ভুলে যাই আমরা, কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক বা শিক্ষিকার ক্লাসরুমের শিক্ষা রয়ে যায় আমাদের সঙ্গে সারা জীবন। কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে শুধু কতগুলো নাম আর ছোট ছোট ছবির সারিকে একটা একা ঘরে বসে পড়ানোর মত বেদনাদায়ক কাজ খুব কমই আছে। “ব্যান্ডউইডথ নেই ম্যাম, ক্যামেরা অন করতে পারছি না”, শুনে শুনে হাল ছেড়ে দিয়েছি আজকাল। মুখহীন, মাঝে মাঝে ভাষাহীন একটা ক্লাসকে দিনের পর দিন মন দিয়ে পড়িয়ে যাচ্ছেন যে শিক্ষিকা, তাকে কেন পুরো মাইনে দেওয়া হবে, এমন প্রশ্ন আমাদের দেশেই ওঠে বোধহয়!

  আর শুধু তো পড়ানো নয়, ছাত্ররা ইচ্ছে মত টোকাটুকি করবে, যৌথ উদ্যোগে পরীক্ষা দেবে, টিউশনের টিচার সাহায্য করে দেবেন, এই সবকিছু জেনেও পরীক্ষা নিতে হয়, খাতা দেখে নম্বর দিতে হয়। যে ছাত্র কোনোদিন ৬০-এর ঘর ছাড়ায়নি, সে এখন ৮০ পাচ্ছে অবলীলায়, সব জেনে বুঝেও কিছু করার নেই শিক্ষককূলের।

  পড়ে কি লাভ?

  বাচ্চাদের মুখে এই কথাটা যে কতবার শুনলাম এই দেড় বছরে! আমার ছেলে (১৪), মেয়ে (৯), একটা পুরো ক্লাস সেরে ফেলল যখন অনলাইন, তখন মেয়ে জানতে চাইল আর কোনোদিন স্কুলে যেতে পারবে কিনা। আমার ডাবল প্রোমোশন পাওয়া মেয়ে, যার কিনা ২-৩ নম্বর কম পেলে চোখ ছল ছল করত, এখন আর পড়তেই চায় না। প্রথম প্রথম অনলাইন পড়াতে খুব উৎসাহ ছিল ওদের - বেশ নিজেদের কেমন বড় বড় লাগছিল, বাবা-মা যেমন মাঝে মাঝে মিটিং করে, ইন্টারভিউ নেয়, টক দেয়, তেমনভাবে নিজেরা ক্লাস করছে, তাতেই খুব আনন্দ। কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হল না এই অবস্থাটা - পাতার পর পাতা লিখছে, কিন্তু খাতা জমা দিতে হচ্ছে না, খাতায় মিস গুড লিখে দিচ্ছেন না, পাওয়া যাচ্ছে না “স্মাইলি” - তাহলে লিখে কি লাভ? “কেন লিখব, মিস তো দেখবে না”, বলতে শুরু করল মেয়ে। আর ছেলে চিরকালই একটু ফাঁকিবাজ, মাথা ভাল বলে ঠিক ভালো নম্বর পেয়ে যায়। এই অনলাইন ক্লাসের জেরে ফাঁকিবাজিটাই রইল, নিয়মের পড়াটা গেল বাদ পড়ে। আত্মীয়, বন্ধু, যার সাথেই কথা বলি, ঘরে ঘরে এই ছবি।

  স্কুল মানে শুধু পড়া নয়, বড় হয়ে ওঠার একটা বড় অঙ্গ স্কুল - বন্ধুত্বের নানা ওঠা পড়া, শিক্ষকদের কাছে বকুনি, তাঁদের ভালোবাসা, নানান দুষ্টুমি, দায়িত্ব নিতে শেখা, ছোট-বড় নানা বয়সের ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করে একজন সামাজিক জীব হয়ে ওঠা, সব কিছুই বাচ্চারা শেখে স্কুলে। অনেক সময় ক্লাসের চাইতে ক্লাসের বাইরের শিক্ষা বড় হয়ে ওঠে তাদের জীবনে। ক্লাসের পড়াতেও, একটু প্রতিযোগীতা, একটু একে অপরকে সাহায্য করা, দেখে শেখা, সবকিছু মিলিয়েই শিক্ষা। খেলাধুলার সঙ্গে সম্পর্ক ভুলে শুধু মোবাইল আর ট্যাব নিয়ে বসে ভিডিও গেম আর ইউটিউবের জগতে হারিয়ে যাচ্ছে আজকের বাচ্চারা, এমন ভয় ছিল অনেকদিন। যেসব মা-বাবারা সন্তানদের হাতে ফোন দিতে নারাজ ছিলেন, এখন বাধ্য হয়েছেন তাঁরাও সেই নিয়ম ভাঙতে - পড়াশোনাটাই যে এখন ফোনে! আর সুযোগ পেয়ে কচিকাঁচারা তার সদ্ব্যবহার করছে। আমার বাড়িতেই, মাঝে মাঝেই দুটো ক্লাসের ফাঁকের টুক করে একটু কার্টুন দেখে নিতে গিয়ে পরের ক্লাসটায় ঢুকতে দেরি করে ফেলছে বাচ্চারা, স্কুলের নিয়মে টীচার দেরীতে ঢুকতে দিচ্ছেন না গুগল মীটের ক্লাসে। ফোনে চলছে বন্ধুদের সঙ্গে আদান-প্রদান, কেউ ক্লাস করছে না, আবার কেউ বা ক্লাস করছে কিন্তু নামেই, ফোনটা ব্যবহার হচ্ছে আড্ডার জন্য। একটা একঘেঁয়েমি, ভালো না লাগা যেন ঘিরে ধরেছে বাচ্চাদের।

  কোভিড ব্যাচ!

  এই বিষয়ে যে নানারকমের মীম দেখে আমরা হাসছি, সেগুলো যে কতটা সত্যি, আর সেই সত্যিটা যে আসলে কি ভয়ানক তা কি আমরা ভাবছি? আমার বাড়িতে ঘর পরিষ্কার করতে আসে সুমিত্রা - ওর ছেলে কলেজে ভর্তি হল গত বছর। উচ্চ মাধ্যমিকে বিশেষ ভালো না করলেও, ছেলেটা ভালো ফুটবল খেলে বলে ঢুকতে পারল কলেজে। প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষায় নম্বর খারাপ হয়েছে বলে সুমিত্রা কান্নাকাটি করল। এরপর হল লকডাউন, কলেজ বন্ধ। সুমিত্রা আগের দিন বলল ছেলে কোনো একটা কাজে ঢুকতে চায়, কোনো এক দাদাকে টাকা দিতে হবে। আমি জানতে চাইলাম পড়ার কি হবে। ছেলে বলেছে কলেজ তো বন্ধ, বাড়িতে বসে না থেকে কাজ করবে। এদিকে মাঝে মাঝে নাকি পরীক্ষা হয়, তখন বন্ধুরা সবাই মিলে পরীক্ষা দিতে বসে। ভালোই নাকি নম্বর পাচ্ছে এখন, অথচ না আছে এদের বই, না আছে খাতা। নিরক্ষর সুমিত্রা বোঝে না এ কেমন পড়া, কিন্তু শিক্ষিত ছেলের ওপর কথাও বলতে পারে না।

  শুধু ছোট কলেজ না, এই ছবি সব জায়গায়। কিভাবে ছাত্রছাত্রীদের অসৎভাবে উত্তর দেওয়া আটকানো যাবে, এই নিয়ে আলোচনা চলছে দেড় বছর ধরে। বাড়িতে বসে পরীক্ষা দিয়ে সবাই খুব ভালো নম্বর পাচ্ছে, কিন্তু শিখছে কতটুকু? বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা ল্যাব কি তা না জেনে প্রাকটিক্যাল ক্লাস করছে ভিডিও দেখে - উপায় কি? সিলেবাস তো শেষ করতে হবে! ভাবুন তো, যারা এভাবে ডাক্তারি পড়ছে, তাদের কাছে আপনি ভবিষ্যতে নিজে যেতে ভরসা পাবেন? এই অর্ধেক জেনে-বুঝে অনেক নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে কেমন নাকানিচোবানি খাবে? এদের মধ্যে কেউ যখন শিক্ষকতা করতে চাইবে, আপনার বাচ্চার শিক্ষক হিসেবে তার ওপর আপনার আস্থা থাকবে? একজন শিক্ষক হিসেবে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত এদের জন্য, আর একজন মা হিসেবে হতাশ।

  না-পাওয়ার দল

  এতক্ষণ বলছিলাম আমাদের মধ্যে বা উচ্চ বিত্ত মানুষদের কথা - যাদের ছেলেমেয়েরা যেমন হোক শিক্ষা পাচ্ছে, অন্তত একটা যোগাযোগ রয়েছে তাদের স্কুলের সঙ্গে, স্কুল খুললে যখন তারা ফিরবে, অনেকটাই হয়ত ক্ষতিপূরণ করা যাবে। কিন্তু যেই বাচ্চাগুলো এই দেড় বছর কোনো ক্লাস করতে পারল না, তাদের মধ্যে কজন আর ফিরবে স্কুলে?

  কিছুদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে একজনের লেখায় পড়লাম - বাজারে একজন মহিলা, দোকানে দোকানে ঘুরে সঙ্গের বছর দশ-এগারোর ছেলের জন্য একটা কাজ খুঁজছিলেন। এক দোকানদার জানতে চাইলেন ছেলে লেখাপড়া কি জানে, তাতে ছেলে মুখ নীচু করে বলল যে ক্লাস থিরি পড়েছে, তারপর লকডাউন। দোকানদার বিচক্ষণ মানুষ, জানতে চাইলেন, স্কুল খুলে গেলে কাজ ছেড়ে পালাবে কিনা সে, তাতে তার মা খুব জোরদিয়ে জানালেন যে কখনই সে কাজ ছেড়ে স্কুলে যাবে না। বাবা নেই, কোভিড তাকে খেয়েছে, এখন বাড়িতে মা আর ছেলে, তার দুই ভাইবোন আর দুই বুড়ো-বুড়ি । স্কুল গেলে তো ছেলে এক বেলা খেতে পায়, কাজ করলে সবাই কিছু খেতে পাবে। ছেলেটা চুপ করে থাকল। লেখক লিখেছেন যে চোখের সামনে একটা অন্যায় হতে দেখেও, কিন্তু কি করবেন ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকলেন, কিন্তু খারাপ লাগাটা এভাবে সবার কাছে খুলে বললেন। এরকম কত হাজার ছেলেমেয়ে ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে। কিছু সমাজসেবী সংগঠন তাদের জন্য কাজ করছেন, কিন্তু তাতেই বা কতটুকু সম্ভব? আমাদের দেশটা যে বড্ড বড়, জনসংখ্যা যে বড্ড বেশী!

  এই পরিবারের মত করুণ অবস্থা হয়ত সবার হয় না, কিন্তু সবার কি সামর্থ আছে স্মার্ট ফোন কেনার, এবং অনলাইন ক্লাস করার জন্য মাসে মাসে ফোনের বাড়তি বিল ভরার? তারপর ধরুন এক পরিবারে দুজনের অনলাইন ক্লাস একসঙ্গে চললে, যদি একটাই ফোন থাকে, কিভাবে দুজনের পক্ষে ক্লাস করা সম্ভব? কোনো পরিবারে হয়ত অগ্রাধিকার পাবে যে বড় সে, কারণ তার পড়া বেশী, আবার কোথাও পুত্রসন্তান। আমাদের সমাজে এখনো সে সুদিন আসেনি যখন ঘরে ঘরে কন্যাসন্তানকে পড়ার জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, আর সেই জন্যই আমাদের এখনও কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাহায্য নিতে হয় মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে।

  ভবিষ্যতের পথে

  অনলাইন পড়াশোনা যেমন আমাদের অনেকের হাতের মুঠোতে এনে দিয়েছে পৃথিবী, অনেক ভালো ভালো ওয়েবিনার শোনা যাচ্ছে ঘরে বসে, টাকার অভাবে আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীদের আর বিদেশের বড় কনফারেন্সগুলোর থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে না, তারা অংশগ্রহন করে নিজেদের কাজ তুলে ধরতে পারছে বিশ্বের দরবারে, আলোচনা করতে পারছে অনেক নামী মানুষের সঙ্গে। কিন্তু অন্যদিকে, যারা সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষ, তাঁরা আরো পিছিয়ে পড়ছেন। যাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁদের সন্তান শিক্ষিত হয়ে তাঁদের জন্য সুদিন নিয়ে আসবে, তাঁদের অনেকের স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে।

  এই মহামারি অনেকভাবেই মেরেছে আমাদের, মেরে চলেছে। সারা পৃথিবীতে এখন একটা বড় ভাগ হয়ে যাচ্ছে ক্ৰমশঃ - যেসব দেশে সবাই ভ্যাকসিন পাচ্ছেন, আর আমরা, যারা পাচ্ছি না। ঠিক সেভাবেই, আমরা নিজেদের মধ্যেও আবার ভাগ হয়ে যাচ্ছি পাওয়া - না পাওয়ার হিসেবে। শিক্ষার অধিকার সবার, এই অধিকার সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথে অনেকটা এগিয়েছিল আমাদের দেশ, কিন্তু আবার পিছিয়ে পড়ছি আমরা। “Haves and have-nots” কথাটার প্রচলন হয়েছিল বিত্তের ক্ষেত্রে - সব পাওয়া আর কিছু না পাওয়া মানুষ - কিন্তু আজকে আমাদের পৃথিবীতে শিক্ষার অধিকারেও তৈরী হয়েছে এই ব্যবধান। যে সব পরিবারে প্রথম প্রজন্ম শিক্ষার আলো দেখতে শুরু করেছিল, এই দেড় বছর স্কুলের সঙ্গে যোগ না থাকায় বাড়িতেও কেউ তাদের একটু দেখিয়ে দিতে পারেনি। কতটুকু মনে আছে এই শিশুদের? পারবে কি তারা স্কুলে ফিরলেও যেখানে সুতো কেটে গিয়েছিল ঠিক সেখান থেকে আবার শুরু করতে? প্রশ্নগুলো সহজ নয়, উত্তর দিতে পারবে ভবিষ্যতই। কিন্তু প্রশ্নগুলো তোলা প্রয়োজন, প্রয়োজন আলোচনার, যাতে আমরা সমাধানের পথে চলতে পারি।

  যে কাজটা অনেক আগে করা প্রয়োজন ছিল, তা হল এই নতুনভাবে পড়ানোর জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওয়ার্কশপ, প্রয়োজন ছিল নতুন পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা, চেনা আদলের বাইরে বেরিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করা, যাতে শিক্ষা একটা বোঝা না হয়ে যায় শিক্ষককূল এবং শিক্ষার্থীদের কাছে। প্রয়োজন ছিল বাবা-মায়েদের সঙ্গে আলোচনার, কিভাবে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারেন, কিভাবে তাঁরা স্কুল এবং শিক্ষকদের সঙ্গে সহযোগীতা করতে পারেন। গত বছর আমার বক্তব্য ছিল, একটা বছর বন্ধ থাকে ক্লাস, বন্ধ থাকে পরীক্ষা, চলুক আমাদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নেওয়া, নিজেদের তৈরী করে নেওয়া, আর তার সঙ্গে ছাত্রছত্রীদের জন্য চলুক নানান ওয়েবিনার, গল্পের বই পড়া, লেখা, আঁকা, গান, নাচ, অভিনয়ের প্রতিযোগীতা। শিখুক ওরা অন্যভাবে একটা বছর, তারপর ফিরব আমরা সবাই রোজকার শিক্ষকতায়, ক্লাস হবে অনলাইন, কিন্তু তার আগে অনলাইন পড়ানোর পদ্ধতিগুলো আয়ত্ত্ব করে নেবেন শিক্ষককূল, ক্লাস হয়ে উঠবে চনমনে। খুব কি ক্ষতি হত, যদি দেশ জুড়ে নার্সারি থেকে এম.এ সবাই মোটে একটা বছর বেশী পড়ত, কিন্তু ভালোভাবে শিক্ষা পেত? যুদ্ধের সময় তো এরকম কত হয়েছে কত দেশে, এই পশ্চিমবঙ্গে একটা টালমাটাল সময় গেছে যখন পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, রেসাল্ট বের হয়নি সময় মত, তিন বছরের জায়গায় পাঁচ বছর লেগেছে বি. এস.সি পাস করতে। আমার বাবা সে সময়ের একজন মানুষ। এমন কি ক্ষতি হয়েছে সেই সময়ের মানুষদের? একটি শিশু যদি আরো একটা বছর পরে স্কুলে যায়, কি এসে যাবে তার? আমি নিজেই পাঁচ বছর বয়সে প্রথম স্কুলে গেছি, নার্সারি ক্লাসে আমি কোনোদিন পড়িনি। বাবার অফিসের বদলির জন্যে দুবারের এক ক্লাসে পড়তে হয়েছে, তাতে কি ক্ষতি হয়েছে আমার জীবনে? কত ছাত্রছাত্রী আইসার থেকে বেরিয়ে এক বছর অপেক্ষা করে বিদেশ যায় নামী জায়গায় পি এইচ ডি করতে, কি ক্ষতি হয় তাদের?

  আমরা আসলে খুব বড় করে ভাবতে চাই না, সামগ্রিক ছবিটা দেখতে চাই না। নিজেদের ছোট পরিধিটুকু অক্ষত থাকলেই আমরা খুশি। এই জন্যই আমরা গাছ কেটে রাস্তা বানাই, বাড়ি বানাই, পুকুর বুজিয়ে দিই, রাস্তায় প্লাস্টিক ফেলি, সারা দিন রাত এসি চালিয়ে আরাম করি, কারণ “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। তার সন্তানের সন্তানের কথা ভাবার প্রয়োজন আমার নেই (এই মুহূর্তে যদিও নিজেদের সন্তানদেরও যে আসলে কত ক্ষতি হচ্ছে তা আমরা অনেকেই বুঝতে পারছি কিনা সন্দেহ আছে)। আমার যা প্রয়োজন আমি নেব, আর কারো চিন্তা আমি করব না। গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে যে যাই বলুক, নিজেরটুকু ঠিক থাকলে কেউ ভাবে না, কেউ কিছু ছাড়তে রাজী নয়। এই মহামারি আমাদের অনেক কিছু চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, শিক্ষার নামে যে প্রহসন চলছে এখন ঘরে ঘরে, একটু তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আমরা যারা শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত, একটু কি সবাই চেষ্টা করতে পারি, ওই দোকানে কাজ করা ছেলেটাকে স্কুলে ফেরাতে? এই যে সময়টা চলে গেল, তা আর ফিরবে না, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা কি আর একটু চেষ্টা করতে পারি আমাদের বাচ্চাদের কাছে পড়াশোনাটা আর একটু মনোগ্রাহী করে তুলতে? নিশ্চয় পারি, পারতেই হবে, ওরা যে আমাদের ভবিষ্যত! ওরা “কোভিড ব্যাচ” হয়ে থেকে যাবে চিরকাল, তা তো আমরা হতে দিতে পারি না, তাই না?

Summary in English
With the sudden lockdown due to the pandemic last year, the workflow concerning the education of students in our country was heavily disrupted. While the inadequately prepared teachers were forced to move to a completely new online teaching system, students faced the larger challenge of adapting to this remote, insipid and isolated online educational model. This article discusses the various aspects of the offline to online movement of teaching and provides an analytical picture of its effects on the society as a whole. It makes us rethink : “What does it mean to be a teacher? What does it mean to be a student?”

This article was written by Dr. Anindita Bhadra upon request by “Abhikkhep” magazine and was shared on their social media outlets in July 2021.

Anindita Bhadra is an Associate Professor at the Department of Biological Sciences and Associate Dean of International Relations and Outreach at IISER Kolkata. She was the Founding Chair of INYAS and is a past Co-Chair of the GYA. She is interested in science education, communication, outreach and policy.

please subscribe to our newsletter

signup with your email to get the latest articles instantly



subscribe

Thank you for subscribing!

Please wait for a few moments while we add you to our mailing list...